/ সোশ্যাল মিডিয়া

ভারত সবসময় গণতন্ত্র এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে বিশ্বাস করে

Admin Publisher

৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ২:৫০ এএম

0 Shares
ভারত সবসময় গণতন্ত্র এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে বিশ্বাস করে

ভারত সবসময় গণতন্ত্র এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে বিশ্বাস করে


ড. শ্রীরাধা দত্ত দক্ষিণ এশিয়া স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ ও গবেষক। ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের অধ্যাপক। দায়িত্ব পালন করছেন নিউ দিল্লিভিত্তিক বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো হিসেবে। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের অধীন ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো হিসেবেও কর্মরত রয়েছেন। পরিচালক ছিলেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজের। পিএইচডি করেছেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন তিনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে কালবেলার সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা। কালবেলা : কয়েক বছর আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন কী অবস্থায় আছে? ড. শ্রীরাধা দত্ত : ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শক্ত এবং মজবুত অবস্থানে রয়েছে। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অনেক বেশি ভালো। উভয় দেশ জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, সামরিক, সামাজিকসহ বিভিন্ন সেক্টরে একসঙ্গে কাজ করছে। এর সঙ্গে রয়েছে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কার্যক্রম। বাংলাদেশ এখন ভারতের সঙ্গে যতগুলো সেক্টরে কাজ করছে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দক্ষিণ এশিয়ায় এ অঞ্চলটি কীভাবে এগিয়ে যেতে পারে তার একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ভারত ও বাংলাদেশ। বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ বিশেষত পরিবহন, অর্থনৈতিক করিডোর তৈরি ইত্যাদি বিষয়ের কথা সার্ক গঠনের সময় থেকেই বলা হচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারত এরই মধ্যে এসব বিষয়ে কাজ করছে। এগুলোকে মূল হিসেবে রেখে উভয় দেশের মধ্যে একটি পরিপূর্ণ নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, যা দুটি দেশের পাশাপাশি গোটা উপমহাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ। ভারতেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ রয়েছে সেখানে। নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে ভারতের ভূখণ্ড থাকায় একটি কারিগরি সমস্যা রয়েছে। ভারতের অংশগ্রহণ ছাড়া নেপাল থেকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানি সম্ভব ছিল না। ভারত নিজস্ব ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। তারা চাইছে বাংলাদেশ নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির সুবিধা উপভোগ করুক। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নানা কো-অপারেটিভ ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, যা আমরা আগে কখনো দেখিনি। আর সবচেয়ে ভালো দিক হলো ভারত ও বাংলাদেশের বিদ্যমান সম্পর্ক দিনে দিনে আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। কালবেলা : সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্কে কোনো ছন্দপতন ঘটেছে কি? ড. শ্রীরাধা দত্ত : বিষয়টা ঠিক সেরকম নয়। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয় বিভিন্ন ইস্যু কেন্দ্র করে। অনেক প্রকল্প সম্পন্ন হতে বেশ খানিকটা সময়ের প্রয়োজন হয়। যেমন আমরা স্থল সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলাম ২০১৫ সালে। কিন্তু এর কাজ শুরু হয়েছিল ২০১০ সালেরও আগে। ২০১৮ সালের পর কভিড মহামারির কারণে একটি বড় সময় গেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে এ সময়ে দুই দেশের মধ্যে বড় কোনো কিছু লক্ষ করা যায়নি। তবে দুই দেশের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ— বাস ও রেল চলাচলের সংখ্যা বেড়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কালবেলা : বাংলাদেশে চীনের বড় ধরনের উপস্থিতি নিয়ে ভারতের কোনো উদ্বেগ রয়েছে কি? ড. শ্রীরাধা দত্ত : সব দেশই তার জাতীয় স্বার্থ দেখে এগোবে, এটাই স্বাভাবিক। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ১৯৭৫ সাল থেকে। বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণ, সামরিকসহ নানা ক্ষেত্রে চীন খুব কার্যকরভাবে কাজ করেছে। কিন্তু বর্ডার ইস্যু থাকায় চীনের সঙ্গে এখন প্রায় কোনো সম্পর্কই রাখছে না ভারত। ভারত বলেছে, সীমান্ত নিয়ে আলোচনা যতক্ষণ না এগোবে, ততক্ষণ চীনের সঙ্গে অন্য কোনো ধরনের সম্পর্ক উন্নয়ন হবে না। ভারত দেখেছে, চীনসহ অন্যান্য ভারতবিরোধী রাষ্ট্র ভারতবিরোধী কার্যকলাপ চালাতে অন্যান্য দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশ, নেপাল ও পাকিস্তানেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। বাংলাদেশ অবশ্যই তার জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী এগোবে। কিন্তু কখনো যদি ভারতের মনে হয় এ জায়গাগুলো চীন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে তখন ভারতের মধ্যে একটি সংশয় তৈরি হয়। তবে এই মুহূর্তে ভারত-বাংলাদেশ যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে সেখানে ভারত বিশ্বাস করে, বাংলাদেশ ভারতের সিকিউরিটি কনসার্নগুলো ভালোমতো বুঝতে পারে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসার পরপরই ভারতের সিকিউরিটি-সংক্রান্ত বিষয়গুলো খুবই পরিষ্কারভাবে সমাধান করেছিলেন। যে কারণেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জায়গাটা আজ এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি অনুযায়ী আমরা জানি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সবসময় ডায়নামিক। সম্পর্কটা কখনোই এক জায়গায় স্থির থাকে না। সে জায়গাতেই ভয়। এ ছাড়া ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে অন্য কোনো সমস্যা নেই। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মতো যেসব দেশের সঙ্গে ভারত খুবই নিবিড়ভাবে কাজ করে, তাদের ভারতের বিরুদ্ধে কেউ ব্যবহার করতে না পারে—সেটাই চিন্তা ও ভয়ের কারণ। এ ছাড়া আর কিছু নয়। কালবেলা : বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্বকে সরব হতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের জন্য পৃথক ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব পদক্ষেপ সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? ড. শ্রীরাধা দত্ত : বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড়। অন্যদিকে বিরোধী দল বিশ্বাস করে, এ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়া যাবে না। ভারতবর্ষে কোনো দিন ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ দেওয়া হয়নি। ভারতের জন্য সেটা প্রয়োজনও হয়নি। কারণ ভারতের কাছে নির্বাচন কমিশন অনেক বড় একটি জায়গা। ভারত নির্বাচন কমিশনকে একটি স্বাধীন এবং শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। সরকার এখানে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারে না। নির্বাচনকে সরকার প্রভাবিতও করতে পারে না। ভারতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের ওপরই ন্যস্ত এবং নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবেই নির্বাচন পরিচালনা করে। বর্তমান সরকারের সময়ে বাংলাদেশে অনেক দারুণ কাজ হয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ অনেক ভালো ভালো কাজ হয়েছে। তাই সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনে এ সরকারের আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু বিগত কয়েক মাস বা এক বছর ধরে এ সরকারের মধ্যে একটি আশঙ্কার ব্যাপার লক্ষ করে যাচ্ছে। কালবেলা : বাংলাদেশের সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে ভারতের অবস্থানকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন? ড. শ্রীরাধা দত্ত : ভারত রাষ্ট্রের চরিত্রটা আসলে একটু অন্যরকম। ভারত কখনো ওরকম এগিয়ে গিয়ে কারও ব্যাপারে কথা বলে না। আপনি যদি রোহিঙ্গা বিষয়টির দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন অনেকেই প্রশ্ন করেন বাংলাদেশ যখন রোহিঙ্গা সংকটের দিকে যাচ্ছিল তখন ভারত কেন কিছু বলেনি? ভারত রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলোতে নতুন করে অনেক বাড়ি তৈরি করে দিয়েছে, ওই এলাকাগুলোতে নানা ধরনের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গেও ভারতের অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে ভারত ঢোল বাজায়নি। এটি ভারতের ফরেন পলিসির একটা ডিফারেন্ট স্টাইল। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেক ভালো হয়েছে। যৌথভাবে অনেক কাজ হয়েছে। এর আগে ২০০১ ও ২০০৬ সালে নন-আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় ছিল, তাদের সঙ্গে কাজ করার জন্যও ভারত অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ওই সময় কোনো জায়গাতেই ভারত এগোতে পারেনি। শেখ হাসিনা আমাদের আশঙ্কার জায়গা এবং সুবিধাগুলো খুব ভালোভাবে বোঝেন। ভারতের হয়তো একটি আশঙ্কা রয়েছে যে, আর কেউ ভারতকে শেখ হাসিনার মতো বুঝতে পারে না। তবে আমি অবশ্যই দেখতে চাইব বাংলাদেশে এটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হোক। ভারত সবসময় গণতন্ত্র এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে বিশ্বাস করে। কে ক্ষমতায় আসবে না আসবে সেটা পরের কথা কিন্তু নির্বাচন ‘ক্রেডিবল’ হতে হবে। ভারতে নির্বাচন কমিশন যাতে সুন্দরভাবে নির্বাচনের কাজ করতে পারে তার জন্য সব রাজনৈতিক দল একসঙ্গে কাজ করে। সুতরাং আমরা নিশ্চয়ই চাইব আমাদের অন্য বন্ধু দেশের জন্যও সেরকম একটি পরিস্থিতি তৈরি হবে। কালবেলা : বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কিছু অমীমাংসিত ইস্যু রয়ে গেছে। সেগুলোর নিষ্পত্তি ঘটছে না কেন? ড. শ্রীরাধা দত্ত : পানি বণ্টনের বিষয়টি বাংলাদেশের কাছে অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পানি বণ্টনের কাজটি অনেক কম হয়েছে, এটা অবশ্যই আমি মানি। তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি আমরা ফেডারেল পলিটিকসে আটকে গেছি, সেটা একটি অন্য ব্যাপার। কিন্তু আমি মনে করি এখন দেশগুলো যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে পানির প্রবাহ নিয়ে কথা বলে সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের আগে দেখতে হবে পানি কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে। দুটি দেশই কৃষিপ্রধান দেশ। দুটি বন্ধুরাষ্ট্রের একসঙ্গে বসে আলোচনা করা দরকার—কার কতটুকু পানি প্রয়োজন, কখন প্রয়োজন এবং কীভাবে সেটির জোগান দেওয়া যায়। দুই দেশের মধ্যে পানি নিয়ে সমস্যা শুধু বছরের তিনটি মাস। কারণ এ সময় নদীতে পানির প্রবাহ কমে যায়। বছরের বাকি ৯ মাস পানির বণ্টন নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। তাই এ তিন মাসের জন্য সমস্যার সমাধান কীভাবে করা যায়, সেটি নিয়ে দুই দেশকে আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রযুক্তিগতভাবে পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে। প্রয়োজনে আমরা নদীগুলোতে যখন পানির প্রবাহ বেশি থাকে, তখন পানি সংরক্ষণ করে রাখতে পারি। এ তিন মাসের সমস্যা কেন আমরা সমাধান করতে পারছি না! পানি বণ্টনের বিষয়টি নিয়ে কেন এত কম কাজ হচ্ছে, তা আমি জানি না। শুধু মুখে মুখে সমাধানের কথা না বলে দুই দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এ সমস্যা সমাধানে আরও বেশি কাজ করা জরুরি। কালবেলা : বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে শুল্কবহির্ভূত কিছু বাধা রয়ে গেছে। এর সমাধান কি খুব কঠিন? শ্রীরাধা দত্ত : বাংলাদেশ থেকে প্রাণ-আরএফএল কোম্পানি ভারতে বিনিয়োগ করেছে। আগরতলায় তাদের কারখানা নির্মাণাধীন অবস্থায় রয়েছে এবং কাজে এগোচ্ছে। আমি এ ধরনের আরও বিনিয়োগের আশা করি। তেমনি ভারত থেকে বাংলাদেশে অনেক বিনিয়োগ রয়েছে। আমি সম্প্রতি ভারত থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োকারীদের সংগঠনের একটি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তারা বলছে, ভারত থেকে এখন আর বাংলাদেশে তেমন বিনিয়োগ আসছে না। আমি সাউথ এশিয়ান ইনভেস্টমেন্ট সামিটির সময় চেম্বার অব কমার্স আয়োজিত কিছু মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তারা অনেকেই বলছেন, তারা বিভিন্ন দেশে ভারতীয় বিনিয়োগ নিয়ে গেছেন কিন্তু তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ নিচ্ছেন না। তারা স্পষ্ট করেই বলেছেন, বাংলাদেশে এমন কিছু গ্রাউন্ড রিয়ালিটি রয়েছে, যা আমরা বুঝতে পারছি না। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, তারা বাংলাদেশের দুর্নীতিসংক্রান্ত ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন। একজন ব্যবসায়ী বলেছেন, ভারতে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে যে বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়, বাংলাদেশে ওই প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে দ্বিগুণ বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। কারণ বাংলাদেশে অনেক বেশি চ্যানেলে উৎকোচ দিতে হয়। তাই যে পণ্যটি আমার দেশে তৈরি করলে আমি সুবিধা পাচ্ছি এবং আমার খরচ কম, সেটা আমি অনেক দূরে গিয়ে ও বেশি খরচে কেন উৎপাদন করতে যাব। আমরা জানি, বাংলাদেশ যতটা ভারতীয় বিনিয়োগ আশা করে ততটা ভারতীয় বিনিয়োগ বাংলাদেশে হয়নি। সরকার একটা নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত সহায়তা দিতে পারে। কিন্তু ফাইনালি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকেই এগিয়ে যেতে হয়। বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য পরিবেশ আরও সহজ করা দরকার। এসব বিষয়ে দুই দেশের আরও অনেক আলোচনার জায়গা রয়েছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে সব দেশই অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে। হয়তো সে কারণে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক বাধাগুলো কিছুটা আড়ালে রয়ে গেছে। তবে পরিস্থিতি ভালো হলে আমি আশা করি এগুলো নিয়ে আমরা আবার এগোতে পারব। কালবেলা : বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে কোন বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি? ড. শ্রীরাধা দত্ত : আমার মনে হয় দুটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি সুবিধা কীভাবে পেতে পারে সেটা আগে দেখতে হবে। আমরা প্রথমে নির্বাচন, সরকার বা এসব সংকটের বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। আমরা এসব বিষয় নিয়ে কেন আলোচনা করি, কারণ আমাদের ভয় হয়, নতুন সরকার এলে বা নতুন দল ক্ষমতায় এলে সম্পর্কটা অন্য জায়গায় চলে যেতে পারে। আমরা কি এখনো সেই জায়গায় পৌঁছেছি যে, ঢাকা এবং দিল্লিতে যে সরকার বা যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, দুই দেশের মধ্যে এরকমই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে। দুই দেশ এরকমই একসঙ্গে কাজ করে যাবে? দুই দেশের মধ্যে ট্রানজিটসহ আরও অনেক বিষয় রয়েছে, যা শুধু খাতা-কলমে সীমাবদ্ধ। যে বিষয়গুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এসব বিষয়গুলোতে ফোকাস করা দরকার। যেমন থার্ড কান্ট্রি ট্রেডের কথা বলা যায়। ভারত-বাংলাদেশ অনেক দিন আগেই থার্ড কান্ট্রি বাণিজ্যের বিষয়ে রাজি হয়েছিল। যেখানে নেপাল এবং ভুটান ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে বাণিজ্য করতে পারবে। এরকমই হওয়া উচিত। কিন্তু এই থার্ড কান্ট্রি ট্রেড চালু হয়েছে সম্ভবত সম্প্রতি। এসব বিষয়ে যেন দীর্ঘসূত্রতা না হয়, এসব বিষয় যেন আটকে না যায় সেদিকে বেশি নজর দেওয়া দরকার। ইউরোপীয় ইউনিয়নে আমরা যেমন দেখেছি, দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে ঝগড়া বা মতভেদ যাই হোক না কেন, ব্যবসা-বাণিজ্য আটকে থাকে না। মানুষের যাওয়া-আসা আটকে থাকে না। শিক্ষার্থী বিনিময়, ব্যবসা-বাণিজ্য বা ট্রাভেল কোনো কিছু আটকে থাকে না। আমাদের অঞ্চলেও সেভাবে দেখা দরকার। মানুষের কাছে সুবিধা যেন সহজে পৌঁছাতে পারে, সেটা নিশ্চিত করা দরকার। সেভাবেই আমরা দুই দেশের সম্পর্ক আরও ওপরে নিয়ে যেতে পারি। কালবেলা : বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে ভূরাজনৈতিক কোনো বিষয় রয়েছে কি? ড. শ্রীরাধা দত্ত : গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে আমেরিকা অনেক আগে থেকেই কথা বলে। তারা বাংলাদেশের র‌্যাবের ওপরে স্যাংশন দিয়েছে, আগামী নির্বাচন কেন্দ্র করে ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে। আমেরিকা মানবাধিকার নিয়ে সবসময় সোচ্চার অবস্থান দেখায়, যা অন্যান্য অনেক দেশ দেখায় না। মানবাধিকার সামিটে আমেরিকা বাংলাদেশকে ডাকেনি, অন্যদিকে পাকিস্তানকে ডেকেছে। অথচ আমরা জানি পাকিস্তানেও নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ। এটি পরিষ্কার যে, কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক কারণে এখানে কিছুটা হিপোক্রেটিক ব্যাপার থাকে। আমরা এটাও জানি যে, ২০০৬ সালের পর যখন বাংলাদেশে আর্মির সহযোগিতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিল তখনো আমেরিকা অনেক সরব ছিল। তখনো আমেরিকা চেয়েছিল সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন। এটি ঠিক যে, আমি আমার নিজের দেশে কী করতে চাই বা কী করব সেটা আমার ওপর নির্ভর করবে। অন্য কারও সেটি বলে দেওয়ার কথা না বা বলে দেওয়া উচিত নয়। কালবেলা : বাংলাদেশের প্রতি চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের আগ্রহী হয়ে ওঠার কারণ কী? ড. শ্রীরাধা দত্ত : গত ১০ বছরে দক্ষিণ এশিয়ার সবকটি দেশের সঙ্গে চীনের অনেক বেশি ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। ২০১৩ সালে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নিয়ে এগিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রকল্পের অনেক কাজই এগোয়নি। এই ইনিশিয়েটিভকে ঘিরে বাংলাদেশেও যে পরিকল্পনাগুলো নেওয়া হয়েছিল, তার সবকিছু না এগোলেও কিছু কিছু কাজ এগিয়েছে। যেমন পদ্মা সেতু এবং পদ্মা সেতু রেলওয়ে। দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের সঙ্গেই আমেরিকার সম্পর্ক ভালো। আমেরিকা ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক ঘোষণা করেছে। তাই হয়তো আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সহযোগিতা চাচ্ছে। তারা কমবেশি সহযোগিতা পাচ্ছেও। ভারত কোয়াডে যুক্ত হয়েছে। তাই এটা পরিষ্কার আন্তর্জাতিক রাজনীতির পাওয়ার প্লে ভৌগোলিকভাবে এশিয়ার দিকে চলে এসেছে। ইন্দো-প্যাসিফিক ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল, এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এ অঞ্চল ঘিরে চীন ও আমেরিকার একটি প্রতিযোগিতার জায়গা তৈরি হয়েছে। কালবেলা : বিএনপি বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। অন্যদিকে সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড়। সে ক্ষেত্রে সমাধান কীভাবে হতে পারে? ড. শ্রীরাধা দত্ত : সবাইকে নিয়েই দেশ চালাতে হয়। সুস্থ ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সবাইকে মিলে কাজ করতে হয়। এখন বাংলাদেশের সংসদে যে বিরোধী দল রয়েছে, সেটা কোনোভাবে বিরোধী দল নয়। এটাকে বলা যায় এক ধরনের সরকারেরই ঠিক করে দেওয়া বিরোধী দল। যদিও আওয়ামী লীগ বলছে তারা কেয়ারটেকার সরকার দেবে না, তবুও অন্য উপায়েও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। কিন্তু সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ওপরে কেউ হস্তক্ষেপ করবে না, তার ভরসা দিতে হবে। আশঙ্কা কিংবা উপায় খুঁজে বের করা—যাই বলি না কেন, সেটা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা ছাড়া সম্ভব নয়। তার জন্য অবশ্যই ক্ষমতাসীন সরকারকেই প্রথম পদক্ষেপটা নিতে হবে। সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করতে চাওয়া বা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চাওয়ার জন্য সরকারকেই অন্য সব দলকে ডাকতে হবে। সরকার এগোলে বিএনপিসহ অন্য দলগুলোও এগোবে বলে আমার ধারণা।

আপনার মূল্যবান মতামত শেয়ার করুন:



এ সম্পর্কিত আরও খবর

জানা গেল এবার ফিতরা কত

জানা গেল এবার ফিতরা কত

২৫  লাখ টাকা নিয়ে উধাও, প্রতারক সবুজের বিরুদ্ধে মামলা

২৫ লাখ টাকা নিয়ে উধাও, প্রতারক সবুজের বিরুদ্ধে মামলা

গরুর মাংস ৫৫০, ডিমের ডজন ১০০ টাকা

গরুর মাংস ৫৫০, ডিমের ডজন ১০০ টাকা

ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বিএসসি পাস মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ

ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বিএসসি পাস মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ

যেসব গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

যেসব গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

ছাত্রকে একাধিকবার ধর্ষণ, শিক্ষিকা গ্রেপ্তার

ছাত্রকে একাধিকবার ধর্ষণ, শিক্ষিকা গ্রেপ্তার

আওয়ামী লীগের ২০ নেতাকর্মীর পদত্যাগ

আওয়ামী লীগের ২০ নেতাকর্মীর পদত্যাগ

৫.৩ মাত্রার ভূমিকম্পে কাপলো রাজধানী

৫.৩ মাত্রার ভূমিকম্পে কাপলো রাজধানী

অভিনেত্রী হুমায়রা হিমু আর নেই

অভিনেত্রী হুমায়রা হিমু আর নেই

Ads
Ads
Full-Screen Image